সুত্র: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নামধারী ভিসি লীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় মারাত্মক আহত হয়েছেন ৮ সাংস্কৃতিক কর্মী। গুরুতর আহত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি কলি মাহমুদসহ অন্যদের সাভারের এনাম মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভিসি পতনের দাবিতে সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মিছিল-সমাবেশ করে ভিসির বাসার সামনে অবস্থান গ্রহণ কর্মসূচি পালন করছে। এদিকে ভিসির পতনের দাবিতে ভিসির বাসার সামনে অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। পাল্টা কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে ভিসিপন্থী শিক্ষকরাও।

রাতে দফায় দফায় ভিসি লীগের ক্যাডাররা আন্দোলনরত শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। রাতের এ হামলায় দুজন শিক্ষক, এক সাংবাদিক ও আরও সাংস্কৃতিক কর্মী আহত হন। ভিসি লীগের ক্যাডারদের হামলার ভয়ে শিক্ষার্থী হলে না ফিরে দু’পক্ষের শিক্ষকদের মাঝে রাস্তায় অবস্থান গ্রহণ করেন। বর্তমানে ভিসির বাসভবনের সামনের গেটে আন্দোলনরত শিক্ষকরা, পেছনের গেটে ভিসি রক্ষাকারী ভিসিপন্থী শিক্ষকরা, সামনের রাস্তায় সাংস্কৃতিক জোটের কর্মীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা এবং বাসভবনের সামনে খেলার মাঠে ভিসি লীগের ক্যাডাররা অবস্থান নিয়ে আছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বিকাল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি কলি মাহমুদকে লোহার পাইপ ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করে মারাত্মক আহত করে ভিসি লীগের কর্মীরা। পরে তারা অডিটোরিয়ামের সামনে সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি মঈন মুনতাসির, আশফিক রেজওয়ান, সুদীপ চক্রবর্তী, তারেকুল ইসলাম অর্ণ, রাহাত, ফরিদ উদ্দীন মাসুদকে এলোপাতাড়িভাবে লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করে। হামলাকারীরা একজনকে মারার পর পানিতে ফেলে দেয়। হামলাকারী সশস্ত্র অবস্থায় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক কর্মীদের খুঁজে বেড়ায়। ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে তারা দিগ্বিদিক ছুটাছুটি শুরু করে। ক্যাম্পাসে চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়। তবে হামলার সব ঘটনা প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের সামনেই ঘটানো হয়। হামলায় গোপালগঞ্জ অধিবাসী শেখ শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে আশরাফুজ্জামান লিটন, মেহেদী হাসান সম্রাট, মিঠুন কুণ্ডু, অর্ণব, ফেরদৌস, সাইফুল ইসলাম শাকিল, সকালসহ ৩০-৪০ জন ভিসি লীগ ক্যাডার সশস্ত্র হামলায় অংশ নেন। অডিটোরিয়ামের সামনে রড উঁচিয়ে সাংবাদিকদের মারার হুমকি দেন শেখ শরিফুল ইসলাম। ভাসানী হলের আরেক আদুভাই শাকিল বলে, আমরা ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে আছি সাংবাদিকদেরও পেটাও।
গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলে নেয়ার পর তাদের সাভারের এনাম মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়। ভিসি লীগের নেতা অছাত্র শেখ শরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করছি। হামলার সঙ্গে ছাত্রলীগের কেউ জড়িত নয়।
রাত ৯টার দিকে বিদ্যুত্ চলে গেলে ভিসি লীগের সন্ত্রাসী আবারও আন্দোলনরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। তাদের হামলায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক একেএম শাহনেওয়াজ, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সোমা মমতাজ, আরেক সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক জোটের কর্মী অরণ্য আহত হন। ভিসি লীগের ক্যাডাররা রড লাঠি নিয়ে বারবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তেড়ে মারতে আসে। তাদের ছোড়া ইটে আহত হন ওই শিক্ষক ও সাংবাদিক। ক্যাডারদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শিক্ষক সমাজের নেতারা রাস্তার পাশে মানবপ্রাচীর গড়ে তোলেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভিসি লীগের ক্যাডাররা রড, লাঠি নিয়ে ভিসির বাসার সামনে খেলার মাঠে অবস্থান করে শিক্ষকদের উদ্দেশ্য কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেন। বিদ্যুত্ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে হাওয়া হয়ে যায় বলে আন্দোলনরত শিক্ষকরা জানান।
অন্যদিকে ভিসি পতনের দাবিতে তার ভবনের সামনে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষক সমাজের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষকরা। গতকাল বেলা একটায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে ‘উপাচার্য বিতাড়ন মঞ্চে’র করেন শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন। একই সঙ্গে ভিসির নির্দেশে তার সময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা অবস্থান করছেন ভিসি ভবনের পেছনের গেটে।
এদিকে গতকাল বেলা ৩টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন। ক্ষত শুক্রবার অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষক সমাজের ভিসি ভবন অবরোধ এখনও চলছে। ভিসি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান হয়। শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, পুলিশ দিয়ে ক্যাম্পাস চলতে পারে না। ভিসিপন্থী শিক্ষক এবং তার লালিত ছাত্রলীগ দিয়ে যে হামলার ঘটনা ঘটেছে তা দ্বারা ভিসি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ তা ফের প্রমাণিত হলো। তিনি উপাচার্য প্রত্যাখ্যান মঞ্চে ছাত্রলীগের আগুন দেয়ার ঘটনারও তীব্র সমালোচনা করেন।
জাবি ক্যাম্পাসে ভিসি লীগ এখন ত্রাস : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে ক্যাম্পাসে গঠন করা হয়েছে গোপালগঞ্জ লীগ বা ভিসি লীগ। কয়েক সন্ত্রাসী আর অছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত সংগঠনটির পরিচালক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির নিজেই। তার আদেশ-নির্দেশে হামলা, সংঘর্ষ, ছাত্র পেটানোই এ সংগঠনের মূল কাজ। ২০১০ সালের ৫ জুলাইয়ের ঘটনার পর ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর এ সংগঠনের যাত্রা। গোপালগঞ্জবাসী এসএম শামীম, শেখ শরিফুল ইসলাম ও আজগর আলীর নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসী, ইভটিজিংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের হাতে গত ৮ জানুয়ারি খুন হন ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্র জুবায়ের আহমেদ। জুবায়ের হত্যার বিচারের আন্দোলনে ভীতি প্রদর্শনের জন্য এ সংগঠনের ক্যাডারদের দিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল মিটিং করান ভিসি অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির। ভিসি পতনের আন্দোলনকে রুখতে গত শুক্রবার হামলাকারী এসব ভিসি লীগ কর্মীদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা থেকে মিছিল শুরু হয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে পুলিশের উপস্থিতিতে শিক্ষক সমাজের নির্মিত ‘উপাচার্য প্রত্যাখ্যান মঞ্চ’ ভেঙে ফেলে এবং সব ব্যানার ফেস্টুন মঞ্চের সঙ্গে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। গত ২০ এপ্রিল রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের অতিথি কক্ষে অছাত্র হিসাবে পরিচিত শেখ শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের সামনে ৭ সাধারণ শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়। সর্বশেষ গতকাল ৭ সাংস্কৃতিক কর্মীকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে এ ভিসিলীগ ক্যাডার। দু’বছর আগে ছাত্রত্ব শেষ হলেও নির্লজ্জের মত ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন এ ক্যাডার। তার সঙ্গে রয়েছে ভাসানী হলের শাকিল, সম্রাট, মীর মশাররফ হোসেন হলের লিটন, আলবেরুনী হলের সকাল ও কামাল উদ্দীন হলের মাসুদ। এদের কারোরই ছাত্রত্ব নেই, কেউবা পরীক্ষা না দিয়ে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। এদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব কাজের হোতা হচ্ছেন সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার প্রশাসনিক অফিসার সাগর। সরকার মো. আজগর আলী ভিসি লীগের আরেক কুখ্যাত ক্যাডার। যার বিরুদ্ধে রয়েছে মুরগি চুরির মতো ন্যক্কারজনক কাজের অভিযোগ।
এসব বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর সুকল্যাণ কুমার কুণ্ডু ও ভিসি অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।