সূত্র:
জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) এবং প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনীতে ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলছে পাসের হার।
একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও।
তবে এই ‘ভালো ফলাফলে আন্ততুষ্টির সুযোগ নেই’- সতর্ক করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ভিত্তিতে শিক্ষার মানের অগ্রগতি দেখা যাবে না।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার পরিবেশ এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ৯৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ ও ইবতেদায়ীতে ৯২ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। আর জেএসসি ও জেডিসিতে পাসের হার ৮৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
তিন বছরের ফলাফল র্পালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালে প্রাথমিক সমাপনীতে ৯২ দশমিক ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। এ পরীক্ষায় গত বছর পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ২৬ শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে প্রাথমিক সমাপনীতে পাসের হার বেড়েছে ৫ দশমিক ০১ শতাংশ।
২০১০ সালে ইবতেদায়ী সমাপনীতে ৮৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ৯১ দশমিক ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। দুই বছরের ব্যবধানে এ পরীক্ষায় পাসের হার বেড়েছে ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ।
অন্যদিকে জেএসসিতে ২০১০ সালে ৭১ দশমিক ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। ২০১১ সালে পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
আর জেডিসিতে ২০১০ সালে ৮১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ৮৮ দশমিক ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। এ পরীক্ষায়ও গত দুই বছরে পাসের হার বেড়েছে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
বিনামূল্যে বই বিতরণ ও উপবৃত্তি দেয়ার সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দাবি করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্য সবাই পাস করবে। আমরা সে দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।”
তবে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও মানের ঘাটতি আছে বলেই মনে করছেন বর্তমান সরকার গঠিত শিক্ষানীতি কমিটির কো-চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী খলিকুজ্জমান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সার্বিক ফলাফলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা উৎসাহিত হচ্ছেন এটা ঠিক। তবে মানের ঘাটতি আছে। আর মানের ঘাটতি থাকলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সফল হবে না।”
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার পরিবেশ এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “গোড়াতেই শিক্ষার্থীরা যে উৎসাহ পাচ্ছে, এটা ধরে রাখতে হবে।”
এবার প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনীতে দুই লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ জন শিক্ষার্থী এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর পূর্ণ জিপিএ পেয়েছিল এক লাখ ৭ হাজার ৭৭৩ জন। এ হিসাবে এবার এক লাখ ২৫ হাজার ৩৬৭ বেশি শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
আর জেএসসি-জেডিসিতে এবছর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৬ হাজার ৯৪২ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার ৫৫২। গত বছরের চেয়ে এবার ১৬ হাজার ৩৯০ বেশি শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ জিপিএ অর্জন করেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষাকে শিক্ষার্থীদের মান যাচাইয়ের পরীক্ষা বলেই মনে করছেন।
তবে ধারাবাহিকভাবে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বেড়ে যাওয়ায় আন্ততুষ্টির কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা দক্ষতা অর্জনের কতগুলো সূচক অর্জন করল এটা দেখতে হবে।
পাসের হার বিবেচনা করে শিক্ষার অগ্রগতি দেখানো যাবে না উল্লেখ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, পাসের হারে অগ্রগতি থাকলেও বিজ্ঞান শিক্ষা এগোচ্ছে না।
“পাসের হার বাড়াতে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে কমপিটিশন হচ্ছে কিনা এটা দেখার বিষয়। সার্বিকভাবে বিভিন্ন সূচকে উন্নয়ন হচ্ছে কিনা এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তরা পরবর্তীতে কেমন করে তাও দেখতে হবে।”
বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন সচিবালয়ে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে জেএসসি-জেডিসি এবং প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেন।
এর আগে সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফলাফলে কপি তুলে দেন তারা।
ফলাফল হস্তান্তরের পর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলসহ রাজধানীর কয়েকটি বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে অন-লাইনে তাদের ফল দেখে। কিশোরগঞ্জের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে উপস্থিত বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কুশল বিনিময় করেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শিশু শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “শিক্ষাঙ্গনে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। এসব পরীক্ষার ফলে সবার পরীক্ষার ভয় কেটে যাচ্ছে।”
প্রাথমিকে বেড়েছে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান
প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনীতে গত বছর ৪৭০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল করলেও এবার এক হাজার ৫৭টির প্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি।
এরমধ্যে প্রাথমিকে ৭১০টি এবং ইবতেদায়ীর ৩৪৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষার ফলাফলে গতবারের চেয়ে শতভাগ ফেল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার ৫৮৭টি বেড়েছে।
প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনীতে শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে এবার।
প্রাথমিক সমাপনীতে ৭২ হাজার ২২৭টি এবং ইবতেদায়ীর ছয় হাজার ৫৩০টি প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। গতবার ছিল এ সংখ্যা ছিল ৭৪ হাজার ৭০৩টি। এবার শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে বেড়েছে চার হাজার ৫৪টি।
জেএসসি-জেডিসিতে বেড়েছে শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠান
এবছর জেএসসি-জেডিসিতে চার হাজার ৮৯৯টি প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। গত বছর এক হাজার ৮৩১টি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ পাস করে।
এ হিসাবে জেএসসি-জেডিসিতে চলতি বছর ৩ হাজার ৬৮টি বেশি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
এই পরীক্ষায় এবার ৮৫টি প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল করেছে। গত বছর শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৪১টি।