সূত্র: হিজাব পরতে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো গতকালও চট্টগ্রাম সরকারি নার্সিং কলেজে অচলাবস্থা অব্যাহত ছিল। ছাত্রীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছেন হিজাব পরতে বাধা দেয়া সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন। ছাত্রীদের বোরকা পরতে বাধা দেয়ায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ আলেমরা।

হিজাব পরতে বাধাদানকারীদের শাস্তি দাবি শীর্ষ আলেমদের

নামাজ ঘরে তালা
এদিকে মানববন্ধন শেষে হলে গিয়ে ছাত্রীরা দেখতে পান তাদের নামাজ ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে কলেজ প্রশাসন। দিনভর তারা নামাজঘর খুলে দেয়ার দাবি জানালেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তা খুলে দেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
পৃথক বিবৃতিতে দেশবরেণ্য আলেমরা হিজাব পরতে বাধাদানকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। তারা বলেছেন, সরকার ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে মাঝে মধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু কিছু গজবের আলামত দেখা দিয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ইসলামী ঐক্যজোট রাজধানীতে প্রতিবাদ সভা করেছে।
চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজে অচলাবস্থা : চট্টগ্রাম বু্যুরো জানায়, হিজাব পরতে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো চট্টগ্রাম সরকারি নার্সিং কলেজে অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মূল ফটকে আন্দোলনরত ছাত্রীরা মানববন্ধন করেছে। এ সময় তারা বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার বহন করে।
এ সময় সেখানে উপস্থিত হন চট্টগ্রাম মেজিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে যাওয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। এ ঘটনায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে ছাত্রীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। আন্দোলনরত ছাত্রীরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাকে তাদের দাবি-দাওয়ার কথা জানান। কমিশন চেয়ারম্যান ছাত্রীদের ক্লাস ও ওয়ার্ডে হিজাব পরিধানে বাধা এবং নামাজঘর বন্ধের কথা শুনে হতবাক হয়ে যান।
এ সময় ড. মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, কিছুতেই হিজাব খুলতে বাধ্য করা যাবে না। এটা সুস্পষ্ট মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ব্যাপারে কলেজ কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঢাকায় গিয়ে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনবেন বলে জানান।
ড. মিজানুর রহমান এ সময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি বলেন, এ হাসপাতালে রোগীর চিকিত্সার পরিবেশ নেই। হাসপাতালের টয়লেটগুলো কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ ব্যবহার করতে পারে না। এটা মানবতার চরম লঙ্ঘন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সব হাসপাতালই নোংরা, কিন্তু চমেক হাসপাতাল অন্তহীন সমস্যায় নিমজ্জিত।
এদিকে ছাত্রীরা মানববন্ধন শেষ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফসিউর রহমানের কাছে স্মারকলিপি দিতে গেলে তিনি তা গ্রহণ করে ছাত্রীদের আজ থেকে ক্লাসে যেতে বলেন। তবে তিনি ওয়ার্ডে ডিউটির ব্যাপারটি খতিয়ে দেখবেন বলে ছাত্রীদের আশ্বস্ত করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজ অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগমকে ফোন করলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আজ থেকে ছাত্রীদের হিজাব পরে ক্লাস নিতে তিনি সম্মত হয়েছেন বলে জানান। তবে হিজাব পরে ওয়ার্ডে ডিউটি পালন করতে ডাক্তারদের আপত্তির কথা জানিয়ে তিনি এ বিষয়ে ছাত্রীদের কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া যায়নি। তবে ছাত্রীরা জানিয়েছে, হিজাব পরে শুধু ক্লাসই নয়, ওয়ার্ডেও ডিউটি পালনের জন্য লিখিত অনুমতি নিতে তারা আজকে আবারও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করবেন এবং অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
এদিকে মানববন্ধন শেষে হলে গিয়ে ছাত্রীরা দেখতে পান তাদের নামাজ ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে কলেজ প্রশাসন। দিনভর তারা নামাজঘর খুলে দেয়ার দাবি জানালেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তা খুলে দেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
শীর্ষ আলেমদের বিবৃতি—বোরকা পরায় বাধাদানকারীদের শাস্তি দিতে হবে : চট্টগ্রামের একটি নার্সিং কলেজে ছাত্রীদের বোরকা পরতে বাধা দেয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ আলেমরা। পৃথক বিবৃতিতে উলামারা ইসলামের ফরজ বিধান হিজাব তথা বোরকা পরতে বাধাদানকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ পরিষদ সভাপতি মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মাদ ইসহাক, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা জাইনুল আবেদীন, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, আইম্মা পরিষদ সভাপতি মাওলানা মহিউদ্দীন রব্বানী, সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ পরিষদের জয়েন্ট সেক্রেটারি ড. খলিলুর রহমান মাদানী, শর্ষিনার ছোট পীর মাওলানা শাহ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দিকী, টেকেরহাটের পীর মাওলানা কামরুল হাসান সাঈদ আনসারী প্রমুখ আলেমরা পৃথক পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন।
বিবৃতিতে দেশবরেণ্য আলেমরা বলেন, এদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিমপ্রধান দেশ। এদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে হিজাব ও হাতে তসবিহ ধরে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন। অথচ সেদেশেই মুসলিম মহিলারা ইসলাম নির্দেশিত ফরজ হিজাব পরিধানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, সম্প্রতি হিজাব পরে ক্লাস করা নিষিদ্ধ ও নামাজকক্ষ তালাবদ্ধ করে রেখেছে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজ কর্তৃপক্ষ। এর আগেও বর্তমান সরকারের আমলে ইসলামের ওপর আঘাত হানার বিভিন্ন অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে কোনো কর্ণপাত করছে না বলে মাঝেমধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু কিছু গজবের আলামত দেখা দিয়েছে। দেশের সংবিধান থেকে মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস মুছে ফেলার পর থেকে নাস্তিক-মুরতাদ ও শয়তানের প্রেতাত্মারা বেসামাল হয়ে ইসলাম ধ্বংসের চক্রান্ত করছে বলে মন্তব্য করে উলামারা সরকারের উদ্দেশে বলেন, এসব ইসলামবিদ্বেষীকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন, অন্যথায় আমরা সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ইমান রক্ষার তাগিদে যে কোনো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য থাকব।
খেলাফত মজলিস: এদিকে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, সরকারের ইন্ধনে ইসলামের ওপর সরাসরি আঘাত শুরু হয়েছে। ছাত্রীদের স্বেচ্ছায় হিজাব পরতে বাধাদান ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। তারা ছাত্রীদের হিজাব পরতে বাধাদান ও নামাজসহ অন্যান্য ধর্মীয় কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি থেকে দূরে থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান। তা না হলে এহেন ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
ইসলামী ঐক্যজোট : অবিলম্বে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজে ছাত্রীদের হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা। অন্যথায় এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। গতকাল বিকালে রাজধানীর মিরপুরে আল ইহসান মাদরাসা মিলনায়তনে ইসলামী ঐক্যাজোট বৃহত্তর মিরপুর শাখা আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় বক্তারা এ ঘোষণা দেন।
বক্তারা বলেন, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত যেমন ফরজ। নারীদের পর্দা করাও তেমন ফরজ। পশ্চিমাগোষ্ঠীর কাছে পর্দা সহ্য হয় না। পর্দায় থাকলে মায়ের জাতিকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। সভায় সভাপতিত্ব করেন ইসলামী ঐক্যজোটের বৃহত্তর মিরপুর শাখার সভাপতি গাজী ইয়াকুব। এতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা ফজলুল করীম, মাওলানা আবদুল হাই, মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ প্রমুখ। এছাড়া সুশীল ফোরাম সভাপতি মো. জাহিদ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সানোয়ার হোসেন শাহেদ এ ঘটনার প্রতিবাদ ও দোষীদের শাস্তি দাবি করেছেন।








