রিজার্ভ উদ্বেগজনক পর্যায়ে : জানুয়ারিতে ৮ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা

সূত্র: উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে গেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অস্বাভাবিক হারে আমদানি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স আয়ের শ্লথগতি, প্রত্যাশিত বৈদেশিক সহায়তা না পাওয়া এবং রফতানি আয় থমকে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২০ নভেম্বর) রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। যা দিয়ে দেশের মোট আমদানির তিন মাসের ব্যয় মেটানোও সম্ভব নয়।

ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত আকুর পেমেন্ট হলে আগামী জানুয়ারিতেই রিজার্ভ ৮ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়ারও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান জানিয়েছেন, রিজার্ভ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

রিজার্ভ কমে যাওয়ার প্রধান দু’টি কারণ চিহ্নিত করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান আমার দেশ-কে বলেন, রফতানি কমে যাওয়া এবং আমদানি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রত্যাশিত বৈদেশিক সহায়তা না পাওয়া।

এতে রিজার্ভ পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমে যাবে।

আর টাকার মান কমলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। রিজার্ভ পরিস্থিতির এ অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে বৈদেশিক সহায়তা ছাড়ের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় কমিয়ে রফতানি আয়ের দিকে বেশি নজর দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রত্যেকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বিদেশি মুদ্রা মজুত থাকতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রতিমাসে গড় আমদানি ব্যয় প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার। গত সেপ্টেম্বরে আমদানি ব্যয় ছিল ৩ দশমিক ২৭ বিলিয়ন বা ৩২৭ কোটি ১৮ লাখ ডলার।

সামনে এই ব্যয় আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই হিসেবে তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ রাখতে গেলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা উচিত ১০ বিলিয়ন ডলার।

এদিকে নভেম্বর-ডিসেম্বরের আমদানি ব্যয় বাবদ শুধু আকুতেই (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) পরিশোধ করতে হবে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও দেশের মোট আমদানি ব্যয় মেটাতে এ সময়ে আরও প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রতি মাসে রেমিট্যান্স খাত থেকে আয় আসে এক বিলিয়ন ডলারের কম। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)’র তথ্য অনুযায়ী দেশে গড়ে প্রতি মাসে রফতানি আয় প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার।

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেকটি পথ বৈদেশিক সহায়তা। চলতি অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া গেছে ২৪৬ মিলিয়ন ডলার। এই হিসেবে মাসে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ মাত্র ৮২ মিলিয়ন ডলার। ফলে সামনের মাসগুলোতে রিজার্ভ পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আমার দেশ কে জানিয়েছেন, আমদানি ব্যয়ের একটি বড় অংশই এখন চলে যাচ্ছে জ্বালানি তেলের পেছনে। সামনে এ খাতে ব্যয় আরও বাড়বে।

আর এই বাড়তি অর্থের জোগান দিতে গিয়েই চাপের মুখে পড়েছে রিজার্ভ।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ১০৭ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর নিষ্পত্তি বেড়েছে ১০২ শতাংশ।

গত অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ০৬ এবং ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। জ্বালানি তেল আমদানির এই ধারা অব্যাহত থাকলে রিজার্ভের ওপর চাপ কোনোভাবেই কমবে না বলে মনে করেন মির্জ্জা আজিজ।

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ায় এরপর বেশ কিছুদিন রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন ডলারের ওপরেই থাকে।

এমনকি আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ার পরও গত তিন বছরে চারবার রিজার্ভ ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। রিজার্ভ ১১ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে গত বছরের অক্টোবর মাসে। ওই বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিন রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।

আর চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে রিজার্ভ বেড়ে হয় ১১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার হয়। তবে রিজার্ভ কমতে শুরু করে গত সেপ্টেম্বর থেকে। গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন (এক হাজার কোটি) ডলারের নিচে নেমে আসে।

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ায় ঈদের আগে শেষ কার্যদিবসে (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ১০ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ঈদের ছুটির পর ৯ নভেম্বর আকুর পাওনা বাবদ ৮৮ কোটি ডলার পরিশোধের পর রিজার্ভ ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

গ্লোবাল ইকোনমিস্ট ফোরামের প্রেসিডেন্ট এনায়েত করিম বলেন, গত তিন বছরের মধ্যে দেশের জনশক্তি রফতানি প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে এবং এ সময়ে আরও সাড়ে পাঁচ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছে।

ফলে গত দেড় বছর ধরেই প্রতি মাসে রেমিট্যান্স আয় ১০ শতাংশ হারে কমছে। অন্যদিকে, রফতানি আয় আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। যে কারণে বিদেশে মার্কিন ডলারের মূল্য হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

এনায়েত করিম আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করে আমদানি ব্যয় মেটানোর সাময়িক প্রচেষ্টা চালালেও তা বেশি দিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভই হুমকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেল আমদানিতেই যেহেতু বেশি ডলার খরচ করতে হচ্ছে তাই সরকারের উচিত দেশীয় জ্বালানি অর্থাত্ প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর জ্বালানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়া।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিচে নেমে আসায় অর্থনীতিতে এক ধরনের চাপ সৃষ্টির আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রফতানি কমে আমদানি বেড়ে যাওয়াসহ বেশ কিছু কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের অনেকেই অবশ্য বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ মুহূর্তে সরবরাহ বাড়ানো অর্থাত্ বৈদেশিক সহায়তার অর্থ বেশি করে ছাড় করানো এবং রফতানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

Share and Enjoy:
  • Print
  • Digg
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Yahoo! Buzz
  • Twitter
  • Google Buzz
  • LinkedIn

Leave a Reply