রাজধানীতে রাতভর পুলিশি অভিযান: গ্রেপ্তার ৫ শতাধিক

সূত্র: আগামী ৩০ নভেম্বর বিএনপি আহূত হরতালকে ঘিরে রাজধানী জুড়ে টান টান পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হরতাল মোকাবেলায় পুলিশের আগাম ব্যবস্থার নামে হয়রানির মুখে শনিবার রাতে কয়েকশ মানুষ রাজপথে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। শুধুমাত্র শনিবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করেছে। গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এরমধ্যে তিন শতাধিক।

বেশিরভাগ থানা এলাকায় পুলিশের বেপরোয়া গ্রেপ্তার অভিযানের কারণে রাত ১০টার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। এরমধ্যেই কর্মস্থল থেকে বাসা-বাড়ি ফেরার পথে মোড়ে মোড়ে পুলিশি হয়রানি ও আটকের শিকার হয়েছেন লোকজন।

বিভিন্ন থানার সিভিল টিমের নামে সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা সামনে যাকে পায় তাকেই হেনস্তা করে গাড়িতে তুলে থানার দিকে নিয়ে যেতে থাকে। শনিবার রাতে রাজধানীর কয়েকটি থানা এলাকা ঘুরে হয়রানির নানাচিত্র লক্ষ্য করা গেছে। থানা হাজতে নিয়ে আটক করে রাখা ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নিতে মধ্যরাতে সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, পল্টন, রমনা, রামপুরা ও খিলগাঁও থানার সামনে স্বজন-পরিজনদের ভিড় জমে উঠতে দেখা যায়।

রাত সোয়া ১০ টার দিকে সবুজবাগ থানার মুগদাপাড়া চাররাস্তা মোড়ে সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা আচমকা হাজির হয়েই উপস্থিত লোকজনকে ধরে ধরে গাড়িতে তুলতে থাকেন। সেখানে পথচারী মনির মেম্বার থেকে শুরু করে ডিম বিক্রি করতে থাকা রহিজউদ্দিন পর্যন্ত কেউ রেহাই পাননি। মাত্র ৮/১০ মিনিটের ঝটিকা অভিযানেই পুলিশ সেখান থেকে ১০/১২ জনকে আটক করে গাড়িতে তুলে সবুজবাগ থানায় নিয়ে যায়। ডিম বিক্রেতা রহিজউদ্দিনের (২৮) স্ত্রী আমেনা বেগম জানান, তার বিরুদ্ধে কোনো রকম মামলা নেই, কোনো রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত নন তিনি। রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত স্বামীকে ছাড়ানোর জন্য সবুজবাগ থানার সামনেই আমেনাকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

সবুজবাগ থানার সামনে আশেপাশে অবস্থান করতে দেখা যায় মনির মেম্বারের ভাতিজা সালাহউদ্দিন, ভাই মহি মিয়া, বোন রিনা আক্তারসহ আরও কয়েকজন। তারা জানান, ব্যবসায়িক কাজ শেষে মোটর সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে তাকে আটক করে থানা হাজতে রাখা হয়েছে। মনির মেম্বারসহ ৮/১০ জনকে কোনো কারণ ছাড়া আটক করলেও সংশ্লিষ্ট দারোগা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের ৩/৪ তারিখের আগে জামিন পাওয়া যাবে না। থানার আশপাশে ভিড় করা লোকজন টাকা-পয়সার বিনিময়ে হলেও আটককৃতদের ছাড়িয়ে নেওয়ার দেন-দরবারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

রাত ১১টা থেকে রাত সাড়ে ১১টার মধ্যেই যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের তিনটি পিকআপ ভরে অন্তত ১৬ জনকে আটক করে নেওয়া হয় হাজতে। লম্বা এক রশিতে কোমরে বাধা আটককৃতদের থানার সামনে গাড়ি থেকে নামানোর সময় রীতিমত গরু-ছাগলের মতো আচরণ করতে দেখা যায়। তাদেরকে টেনে হেচড়ে নেওয়ার সময় নাজমুল হক নামের একজন কনস্টেবল জানান, হরতালের কারণে তাদের আটক করা হয়েছে। রোববার সকালেই কোর্টে চালান দেওয়া হবে। তবে ওই পুলিশ ভ্যানে দায়িত্বরত উপপরিদর্শক গোলাম মোস্তোফা বাংলানিউজকে বলেন, আটককৃতদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে পেন্ডিং মামলা আছে। তারা এলাকায় নানারকম অপরাধ কাজে জড়িত। কিন্তু আটককৃত সাইফুল ইসলাম (২৬) ওই উপপরিদর্শকের সামনেই প্রতিবাদ করে জানান, তিনি সূত্রাপুরের একটি প্রেসের কর্মচারি। প্রেস থেকে ফেরার সময় হাতে টিফিন বাটি থাকা সত্তেও রিকসা থেকে নামিয়ে আটক করা হয়। তিনি কোনো রাজনীতি করেন না, কোনো জিডিও তার বিরুদ্ধে নেই বলে দাবি করেন সাইফুল।

রাত পৌনে ১২টার দিকে মুগদা স্টেডিয়াম গেটের উল্টোপাশের রাস্তায় সবুজবাগ থানার টহল টিমের গ্রেপ্তার বাণিজ্য ছিল অন্যরকম। সেখানে থানার অপারেশন অফিসার জামান নিজেই সিভিল টিম নিয়ে গ্রেপ্তার অভিযান চালান। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই সিভিল টিমের পুলিশ সদস্যরা ৯ জনকে আটক করে গাড়িতে তুলে। তবে মাত্র তিনজনকে থানা হাজতে নিলেও বাকিদের টাকার বিনিময়ে পথিমধ্যেই ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাত ১২টা ১০ মিনিটে খিলগাঁও থানার সামনে ৮/১০ জন নারী ও থানা গেটের উল্টোপাশে আরও ১০/১২ জন লোককে অপেক্ষারত দেখতে পাওয়া যায়। তালতলা এলাকার বাসিন্দা মমতাজ বেগম (৩২) জানান, তার স্বামী আজগর মোল্লা (৪০) ও ছেলে শরীফ (১৪) কে রাত ১০ টার দিকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। বাসায় ঘুমন্ত অবস্থায় আটককৃত আজগর ও শরীফের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ সে বিষয়টি জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন। তিনি বাংলানিউজকে জানান, গত হরতালে খিলগাঁও খিদমাহ হোটেলের সামনে একটি প্রাইভেটকারে অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়। ওই মামলায় তারা জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িত না থাকলে রাতেই ছেড়ে দেওয়া হবে। অন্যথায় হরতালের পর কোর্ট থেকে জামিনে বের করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

রাজধানী জুড়ে শনিবার রাতে এভাবেই গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। রাত ২টার মধ্যে নগরীর বিভিন্ন থানায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এরমধ্যে সবুজবাগ থানায় ২১ জন, খিলগাঁও থানায় ১৩ জন, বাড্ডা থানায় ১২ জন, রামপুরায় ৯ জন, যাত্রাবাড়ীতে ১৭ জন, গেণ্ডারিয়ায় ১২ জন, শ্যামপুরে ৯ জন, কদমতলীতে ৬ জন, ডেমরায় ৭ জন, সূত্রাপুরে ১৩ জন, কোতোয়ালীতে ১২ জন, মতিঝিলে ১৩ জন, পল্টনে ১২ জন, রমনায় ১২ জন, শাহবাগে ৫ জন, কলাবাগানে ৮ জন, ধানমণ্ডিতে ১৫ জন, মিরপুরে ৮ জন, শাহআলীতে ৪ জন, পল্লবীতে ১১ জন, দারুসসালামে ৭ জন, হাজারীবাগে ৬ জন, লালবাগে ১০ জন, চকবাজারে ৩ জন, কামরাঙ্গীর চরে ১২ জন, গুলশানে ১১, উত্তরায় ৮ জন, বিমানবন্দরে ৩ জন, তুরাগে ৬ জনসহ মোট তিন শতাধিক গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আগে দায়েরকৃত নানা অরাজকতা সৃষ্টি, পুলিশি কাজে বাধাদান, গাড়ি ভাঙচুর ও রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি সংক্রান্ত একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় বলে থানা সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (দণি) উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিগত দুটি হরতালে গাড়ি ভাঙচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ৪১টি মামলা রুজু হয়। এসব মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি, তাদের সহযোগী এবং সন্দেহভাজনদের তালিকা নিয়েই পুলিশ কাজ করছে। গোয়েন্দা পুলিশের অপর উপকমিশনার (উত্তর) মাহবুবুর রহমান শনিবার রাত সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত অর্ধশতাধিক জনকে গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেছেন।

Share and Enjoy:
  • Print
  • Digg
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Yahoo! Buzz
  • Twitter
  • Google Buzz
  • LinkedIn

মন্তব্য করুন