মহাসড়কে যাতায়াত বিড়ম্বনা

সুত্র: মহাসড়ক ধরে ঢাকা থেকে বের হওয়ার সব কটি পথেই স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় তিনটি ফেরিঘাট বন্ধ হওয়ার কারণে দক্ষিণের ১৭ জেলার সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটও প্রায় ২০টি (দক্ষিণের ১৭টিসহ) জেলার যানবাহনের চাপে প্রায় স্থবির।

আবার সড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে ১০ জেলার যোগাযোগের পথ ঢাকা-চট্টগ্রাম ও উত্তরের ১৬ জেলার সংযোগ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
তবে যাত্রীদের ভিড় বেশি হলেও কেবল ট্রেন ও লঞ্চে যাত্রা এখনো কিছুটা নির্বিঘ্ন আছে।
ঈদুল আজহা ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে সড়কপথে মানুষ ঘরে ফেরা শুরু করেছে। কিন্তু পথের ভোগান্তিতে ভ্রমণের আনন্দ তিক্ততায় পরিণত হচ্ছে। শিগগির এই অবস্থার উন্নতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে ঘরমুখী মানুষকে আগামী কয়েক দিন পথে পথে বিড়ম্বনা পোহাতে হবে।
পদ্মা পাড়ি দিয়ে ঢাকার সঙ্গে যাতায়াতে মাওয়া ও পাটুরিয়া ফেরিঘাট ব্যবহার করতে হয়। সড়কপথের যাত্রীরা এ দুই ঘাটেই এখন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পাহাচ্ছে। জানতে চাইলে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ঈদে ৫০ থেকে ৬০ লাখ লোক ঢাকা ছেড়ে যায়। এত মানুষের চাপ নেওয়ার মতো সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দেশে নেই। তার পরও সীমিত ব্যবস্থার মধ্যে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি দাবি করেন, ঈদের আগেই মাওয়া ঘাটের সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। ঈদ ও পূজায় মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে যোগাযোগ, রেল, নৌপরিবহন, স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
সাধারণত ঈদের পাঁচ দিন আগে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা পুরোদমে শুরু হয়। এবার ঈদের আগে পূজা থাকায় মানুষের ঘরে ফেরা আসলে শুরু হয়ে গেছে ২০ অক্টোবর থেকেই। সড়কপথের দুর্ভোগের কারণে ট্রেন এবং লঞ্চেও চাপ বেড়ে গেছে। ট্রেনের অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীদের যাত্রা গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও গতকাল যাত্রীদের বাড়তি ভিড় দেখা গেছে।
সড়কপথে ঢাকা থেকে বের হওয়ার এবং ঢাকায় প্রবেশের পথ মূলত পাঁচটি। চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলের মানুষ ব্যবহার করে কাঁচপুর সেতু হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ চলাচল করে ঢাকা-মাওয়া ও ঢাকা-পাটুরিয়া ঘাট হয়ে। রাজশাহী-বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের মানুষের চলাচলের পথ টাঙ্গাইল হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের মানুষের ভরসা গাজীপুর হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক।
ফেরিঘাট বন্ধ, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও মহাসড়কে দুর্ঘটনায় এসব পথে কয়েক দিন ধরেই অচলাবস্থা চলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যত্রতত্র কোরবানির পশুর হাট। আগামী কয়েক দিন পশুর হাটের সংখ্যা ও ব্যাপ্তি আরও বেড়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে সড়ক যোগাযোগের এ পাঁচটি পথ সচল রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৫ দিনের কম সময়ের ব্যবধানে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় তিনটি ফেরিঘাট নদীতে বিলীন হওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ অচল হয়ে পড়ে। গতকাল জোড়াতালি দিয়ে দুটি ফেরিঘাট নির্মাণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘাটে যানবাহনগুলোকে ১০০ গজ পাড়ি দিতে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) আশিকুজ্জামান বলেন, স্বাভাবিক সময়ে তাঁদের ফেরি ২৪ ঘণ্টায় ৮০ বার আসা-যাওয়া করে এবং আনুমানিক দুই হাজার যানবাহন পারাপার করে। কিন্তু ঘাট-সংকটের কারণে ফেরি পারাপার অর্ধেকে নেমে এসেছে। গতকাল সকাল ছয়টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত সাড়ে আট ঘণ্টায় মাত্র ১৪টি ফেরি চলেছে।
মাওয়ায় ফেরিঘাটের সংকটের কারণে যানবাহনের চাপ পড়েছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে। এ দুই ঘাটে আবার শুরু হয়েছে পশুবাহী যানবাহনে চাঁদাবাজি। ফলে পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়ার দুই পাড়েই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান উড়ালসড়ক নির্মাণ ও মেঘনা-গোমতী সেতুর মেরামতকাজের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে যানজট লেগেই থাকছে। এর মধ্যে গতকাল ভোর সাড়ে ছয়টায় কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যান বিকল হলে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পশু ও পণ্যবোঝাই ট্রাক চলাচল বেড়ে যাওয়ার কারণে ঢাকা বাইপাসের মদনপুর থেকে রূপগঞ্জের কাঞ্চন সেতু পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ বাইপাস সড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ছেদ করে গেছে। তাই ঢাকা বাইপাসের যানজটের প্রভাব দুটি মহাসড়কেও পড়েছে।
টাঙ্গাইলের আশেকপুরসহ কয়েকটি স্থানে কোরবানির পশুবোঝাই একটি ট্রাক বিকল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতুতে মেরামতকাজ চলার কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা এক লেনে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন স্থানে দিনভর যানজট হয়। বেলা ১১টার দিকে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার লেনটি চালু করার ব্যবস্থা করেন।
পুলিশ সুপার হাফিজ আক্তার বলেন, ঈদের আগে এ মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় সেতুর মেরামতকাজ অব্যাহত রাখলে তা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে। তিনি বলেন, ঢাকায় যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তিনি আগামী আট দিন সেতুতে কাজ বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
হাইওয়ে পুলিশের এলেঙ্গা ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সার্জেন্ট কামরুজ্জামান বলেন, রোববার রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে মির্জাপুর সীমানার মধ্যে বেশ কয়েকটি গরুবাহী ট্রাক বিকল হয়ে যায়। বিকল হওয়া ট্রাকগুলো মহাসড়ক থেকে সরানোর আগেই বিভিন্ন স্থানে তীব্র জট লেগে যাচ্ছে।
অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আবদুল্লাহপুর সিগন্যাল, টঙ্গীর স্টেশন রোড ও সদর উপজেলার চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া ঢাকা বাইপাস মোড়েও যানজটে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের।

Share and Enjoy:
  • Print
  • Digg
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Yahoo! Buzz
  • Twitter
  • Google Buzz
  • LinkedIn

Leave a Reply