প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দুদক কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নেতাসহ ১১ জন গ্রেফতার

সুত্র: বিসিএস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতা দুদক কর্মকর্তা, ছাত্রলীগ নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২০টি ঘড়িসদৃশ মোবাইল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। গত রোববার রাতে রাজধানীর শাহবাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও খিলগাঁওয়ের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় তাদের। গতকাল দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলো দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিদর্শক মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা অমিতাভ চৌধুরী, ফিন্যান্স বিভাগের সন্ধ্যাকালীন এমবিএর ছাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র হাবিবুর রহমান হাবিব (২৪), সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক ছাত্র নুরুল হুদা ওরফে ডলার মাহমুদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র রুবেল বিশ্বাস, আজিজুল হক শিশির, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ইসতিয়াক আহমেদ পরশ, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ছাত্র সাজ্জাদ হোসেন, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএ সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র রেফায়েত সানি ও কফিল উদ্দিন মাহমুদ। এদিকে দুদকের সহকারী পরিদর্শক মফিজুরকে গতকাল সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দুদকের পাবলিক রিলেশন অফিসার প্রণব ভট্টাচার্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি মশিউর রহমান জানান, জালিয়াতচক্রটি ডিজিটাল চুরির মাধ্যমে অভিনব কায়দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করছিল। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কিছু ঘড়ির মাধ্যমে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে প্রশ্নের উত্তর। আর এজন্যই পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। পুলিশ বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ও পিএসসি, ব্যাংকসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তবে এদের মধ্যে মফিজুর, কফিল উদ্দিন ও রেফায়েত সানি হচ্ছে প্রধান। এছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষক-কর্মচারী এবং রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মী জড়িত আছেন।
এডিসি মশিউর রহমান জানান, ১৯ অক্টোবর শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শেষে হারুন-অর-রশিদকে ঢাবির কয়েকজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের ২০৮ নম্বর রুমে আটকে রেখে তার বাবার কাছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমজাদ আলীর সহযোগিতায় সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় জাহাঙ্গীরনগরের রুবেল ও শিশির এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাবিবুরকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে রোববার গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও খিলগাঁওয়ে অভিযান চালিয়ে অন্যদের গ্রেফতার করা হয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা মশিউর বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ভর্তি পরীক্ষা ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পরীক্ষার হল থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন শিক্ষক ও কর্মচারীর মাধ্যমে পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরপরই অথবা কয়েক মিনিট আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন। পরে সিন্ডিকেটের এক্সপার্ট গ্রুপ—যারা বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান ইত্যাদিতে দক্ষ, তাদের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করে এবং মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে তার সঙ্গে চুক্তি থাকা বিভিন্ন পরীক্ষার্থীর ঘড়িসদৃশ মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নকলের কাজে ব্যবহৃত এসব মোবাইল দেখতে অবিকল ঘড়ির মতো। এগুলো দিয়ে এসএমএস পাঠানো, এসএমএস রিসিভ, ভিডিও রেকর্ডিং ইত্যাদি করা যায় এবং এগুলো দেখতে ঘড়ির মতো বলে পরীক্ষা হলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ হলেও জব্দ করা হয় না। এতে সহজেই এসব মোবাইলে আসা এসএমএস পাঠ করে কিংবা ভিডিও রেকর্ডিংকৃত নকল নোট ব্যবহার করে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় পাস করে চাকরি পায়। প্রশ্ন ফাঁসকারি এসব সিন্ডিকেটের কাছে প্রায় ১২২টির মতো ঘড়িসদৃশ মোবাইল আছে। এরা চীন থেকে ঘড়িগুলো আমদানি করেছে বলে জানান মশিউর রহমান।
এডিসি মশিউর রহমান বলেন, মফিজ ও কফিল ১ থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেবে এ শর্তে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে চুক্তি করে। পরশ, রুবেল, সাজ্জাত, হাবিব পরীক্ষার্থীদের সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয় এবং তার বিনিময়ে তারা কমিশন পায় এবং সানি, মামুন, ডলার মাহমুদ, অমিতাভ এক্সপার্ট গ্রুপের সদস্য। তারা প্রশ্নপত্রের প্রতিটি ভাগ সমাধান করে দেয়ার বিনিময়ে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকে। এরা ঢাকা শহরের ঢাকা কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, ইডেন কলেজ, সিটি কলেজ, মিরপুর বাংলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর যোগসাজশে পরীক্ষার আসন পরিবর্তন করে সুবিধাজনক স্থানে বসার ব্যবস্থা করে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে যাতে শিক্ষকরা হলে ডিউটি করার সময় অসুবিধা সৃষ্টি না করে, সেজন্য তাদের সঙ্গে আর্থিক চুক্তিও করে থাকে। তিনি জানান, এ গ্রুপের অনেকেই বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের সঙ্গে জড়িত আছে। প্রশ্ন ফাঁসকারী এ সিন্ডিকেট সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা হাবিব জানিয়েছেন, পূর্বপরিচিত হওয়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র হারুনকে তার রুমে আটকে রাখে। পরে তার মোবাইল নম্বর দিয়ে এসএ পরিবহনে মাধ্যমে হারুনের বাবাকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাঠাতে বলে। সে টাকা আনতে গেলে পুলিশ তাকে ও রুবেলকে গ্রেফতার করে। ভুক্তভোগী হারুন বলেন, ভর্তি পরীক্ষার সময় একটি ঘড়ি দেয়া হবে। এ ঘড়ির মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের সব উত্তর পাঠিয়ে দেয়া হবে। এভাবে ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার জন্য তিনি শিশির ও রুবেলকে দেড় লাখ টাকা দিতে চান। কিন্তু গত শুক্রবার সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে ভয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ঘড়িটি নিতে অস্বীকার করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা দিতে এলে তাকে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে তাকে লোহার রড দিয়ে পেটানোর পর বাবার মোবাইলে ফোন করে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এসএ পরিবহনের মাধ্যমে পাঠাতে বলা হয়।

Share and Enjoy:
  • Print
  • Digg
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Yahoo! Buzz
  • Twitter
  • Google Buzz
  • LinkedIn

Leave a Reply